৫ বছরে বৈদেশিক সহায়তার অর্ধেকও মেলেনি : দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা ফিরিয়ে নিচ্ছে দাতারা
৫ বছরে বৈদেশিক সহায়তার অর্ধেকও মেলেনি : দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা ফিরিয়ে নিচ্ছে দাতারা
দুর্নীতি, অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা ফিরিয়ে নিচ্ছেন দাতারা। গত পাঁচ বছরে প্রতিশ্রুত ঋণ-সহায়তার অর্ধেকও পাওয়া যায়নি দাতাদের কাছ থেকে। এতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে দাতাগোষ্ঠী ১৯৫৮ কোটি মার্কিন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু গত অর্থবছরের হিসাব অনুসারে সরকার পেয়েছে মাত্র ৮৮৭ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা। এজন্য পাইপলাইনে যুক্ত হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে একবার সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলে তা স্বাভাবিক হতে সময় লাগে। সরকারের সঙ্গে দাতাদের সম্পর্কে ভাটা পড়ার পর স্বাভাবিক করতে ব্যাপক তত্পরতা চালানো হয়। কিন্তু এ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তায় অর্থছাড়ে সতর্কতা অবলম্বন করছে দাতারা। এ অবস্থায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় না হওয়ায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নানমুখী চাপ পড়ছে। প্রায় তিনগুণ অর্থ পাইপলাইনে পড়ে থাকলেও অর্থের অভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন করতে পারছে না সরকার। বৈদেশিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে এরই মধ্যে এডিপি কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থ সহায়তা ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, কোনো প্রকল্পের অনুকূলে অর্থ সহায়তা ফিরিয়ে নিলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অবকাঠামো, স্বাস্থ্য খাত বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দাতারা অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে দেশীয় তহবিল থেকে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। ফলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়ে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার ব্যাংকিং খাতে হাত বাড়ায়। যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরে দাতাগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ১ হাজার ৯৫৮ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা পাওয়ার আশ্বাস পাওয়া যায়। কিন্তু ২০১২-১৩ অর্থবছরের হিসাব অনুসারে সরকার পেয়েছে মাত্র ৮৮৭ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা।
হিসাব করলে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৯৮ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে অর্থছাড় হয় ২২২ কোটি ডলার। পরের অর্থবছরে ৫৯৬ কোটির বিপরীতে ছাড় হয় মাত্র ১৭৭ কোটি ডলার। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৪৭৬ কোটির প্রতিশ্রুতি থাকলেও পাওয়া যায় মাত্র ২১২ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের প্রতিশ্রুতির অর্ধেকেরও কম অর্থ ছাড় করেছে দাতারা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৯০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে পাওয়া গেছে ২৭৬ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তা। সহায়তার আশ্বাস এবং সেই অনুসারে সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করার পরও অর্থ ছাড়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এসব কারণে পাইপলাইনে রেকর্ড পরিমাণ ১৮৫৬ কোটি ডলার আটকে রয়েছে।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই মহাজোট সরকারের সঙ্গে দাতাদের বিরোধ শুরু হয় সরকারি ক্রয় আইন সংশোধন নিয়ে। সে সময় ২ কোটি টাকার কম অর্থের সরকারি কেনাকাটায় কিছুটা ছাড় দিতে চায় সরকার। বিষয়টির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে দাতারা অভিযোগ করেন, এর মাধ্যমে সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতির সুযোগ বাড়বে। বিষয়টি ঘিরে দু-পক্ষের দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় ৩৬টি প্রকল্পে তিন মাসের জন্য অর্থছাড় বন্ধ করে দেয় শীর্ষ দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কেনাকাটায় ছাড় দেয়া হবে না এমন শর্তে বাংলাদেশ রাজি হলে পরবর্তী সময়ে অর্থছাড় শুরু করে সংস্থাটি। এরপর দাতাদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে পদ্মা সেতু প্রকল্পকে ঘিরে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্পর্কের অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে এতদিন অর্থছাড় কম হলেও চলতি বছরে আলাদা একটি কারণে সহায়তা কমে যেতে পারে। কেননা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জাতীয় নির্বাচনের অনিশ্চয়তা দূর করতে বলছে দাতারা। এজন্য চলতি অর্থবছরের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ে তারা খুবই সতর্ক। অর্থবছরের তিন মাসের চিত্র দেখলে এটা বোঝা যায়। ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে দাতা সংস্থাগুলোর প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি ৮৯ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৬৫ কোটি ৭১ লাখ ডলার। এ হিসাবে প্রথম প্রান্তিকে অর্থছাড়ের পরিমাণ কমেছে ৪৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দাতাদের প্রতিশ্রতির মধ্যে অনুদানের পরিমাণ ছিল ৮৯ লাখ ডলার। আর ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ।
ইআরডি’র নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় করতে আওয়ামী লীগের সফলতা বরাবরই কম। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ৮৯ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার সহায়তা প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ১০৫ কোটি ৫৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার অর্থছাড় হয়। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর পর্যন্ত সময়কালে ৮৪৯ কোটি ২১ লাখ ২৯ হাজার ডলার প্রতিশুতির বিপরীতে অর্থ আদায় হয়েছে ৮০২ কোটি ৭৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এ সময়ে মাত্র ৪৬ কোটি ৪১ লাখ ৬৯ হাজার ডলার অনাদায়ী থাকে। প্রতিশ্রুতির বিপরীতে বৈদেশিক সহায়তা এসেছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই বৈদেশিক সহায়তায় আবার নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। ২০০০-০১ অর্থবছর পর্যন্ত সময়কালের পাঁচ বছরে প্রতিশ্রুতির মাত্র ৭৫ শতাংশ অর্থ ছাড় হয়েছে। ৯৬২ কোটি ৮২ লাখ ১৫ হাজার ডলার প্রতিশ্রুতির মধ্যে এ সময় ২৪০ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার ডলার অনাদায়ী থাকে।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আবার প্রতিশ্রুতির চাইতে বেশি সহায়তা আসে। ২০০১-০২ অর্থবছরে ৮৭ কোটি ৮৭ লাখ ৪৪ হাজার ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ১৪৪ কোটি ২২ লাখ ৩৪ হাজার ডরার ছাড় হয়। প্রতিশ্রুতির চাইতে ৫৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বেশি সহায়তা আসে ওই বছরে। ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ বছরে ৭৮৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ৭১১ কোটি ৬৮ লাখ ডলার ছাড় হয়। এ সময়ে সহায়তা প্রাপ্তিতে সফলতার হার ৯০ শতাংশের বেশি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে ৫০৯ কোটি ৮৬ লাখ ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে অর্থছাড় হয়েছে ৩৬৯ কোটি ২১ লাখ ডলার। অর্থপ্রাপ্তিতে সফলতা প্রায় ৭২ ভাগ। আর চলতি সরকারের মেয়াদে বৈদেশিক অর্থ ছাড়ে সফলতার হার ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/11/10/223985#.Un_JeSfjWcw