অস্বস্তিতে দেশের রফতানি খাত

অস্বস্তিতে দেশের রফতানি খাত

ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই অস্বস্তিতে রয়েছে দেশের রফতানি খাত। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে রফতানি আয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও টাকার মান বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি সঙ্কটের সম্মুখীন রফতানিমুখী পোশাক খাত। এ খাতের প্রতিযোগী অন্য দেশের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দর কম থাকায় সেসব দেশ তুলনামূলক কম দামে পোশাক সরবরাহ করছে। ফলে ক্রেতারা বাংলাদেশ ছাড়া বিকল্প দিকে ঝুঁকছেন।
একদিকে রেমিট্যান্স আয় কমলেও বাংলাদেশ ব্যাংক অব্যাহতভাবে ডলার কিনে কিনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে চলতি মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৭ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অথচ রেমিট্যান্স প্রবাহের হিসাবে দেখা যায়, চলতি বছরে জুলাই-সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩২৭ কোটি ৩ লাখ ডলার। গত বছর এ সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৫৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৮ কোটি ডলার কমেছে।
কিন্তু অন্যদিকে রেমিট্যান্স কমলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে গিয়ে অব্যাহতভাবে ডলার কেনায় টাকার মান শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের পণ্যের দাম বিদেশের বাজারে বেড়ে যায়। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত এবং প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য রাষ্ট্র যেমন ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশে ডলারের মান বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এসব দেশের পণ্য বিদেশের বাজারে সস্তা হয়েছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্প খাতে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ কারেন্সি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি মাসে টাকার বিপরীতে ডলারের মান ৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। জানুয়ারি মাসে এক ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৭৯ টাকা থেকে ৮০ টাকা। এর আগে টাকার বিনিময় হার সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। গতকালের হিসাব মতে ৭৭ টাকা।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে পোশাক শিল্পের মালিক ও রফতানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, গত জুলাইয়ের পর এ পর্যন্ত পোশাকের রফতানি আয় কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, গত কয়েক মাসে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে ২৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্যদিকে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম কমেছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। এটা বাংলাদেশের পোশাকের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তেমনি ভারতের জন্য বড় সুবিধা বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, টাকার মান শক্তিশালী হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত পোশাক আমদানিকারকদের রফতানি আদেশ এখন ভারত ও ভিয়েতনামে চলে যাচ্ছে। এছাড়া রফতানিকারকদের জন্য পৃথক হারে বৈদেশিক মুদ্রার ্তুবিশেষ বিনিময় হার্থ নির্ধারণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে জটিলতার কারণে শুধু পোশাক খাতেই ২৫ শতাংশ রফতানি আদেশ কমেছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত চামড়া শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অস্থিরতার কারণে কোরবানির পশুর চামড়া পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, রফতানি খাতের প্রায় প্রতিটি শাখায় গতি থেমে যাচ্ছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাদুকা, হিমায়িত খাদ্য এবং প্লাস্টিক খাতসহ অন্য খাতের রফতানি কমেছে।
জানা গেছে, তৈরি পোশাক খাতে রফতানিতে গত দুই মাসে (আগস্ট-সেপ্টেম্ব্বর) ক্রয়াদেশ কমেছে ২৫ শতাংশ। এই পোশাক খাত থেকে রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশই আসে, যার পরিমাণ সাড়ে ২১ বিলিয়ন ডলার। হরতালের কারণে একদিনে এ খাতের ক্ষতি হয় ২০০ কোটি টাকা। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান রফতানি আদেশ বন্ধ করে দিয়েছে। যারা আদেশ দিচ্ছে তারাও আগের চেয়ে কম দিচ্ছে। এ অবস্থায় এ খাতের উদ্যোক্তারা হতাশ।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলেন, পোশাক খাত হরতালের আওতামুক্ত থাকলেও এর সুফল পান না তারা। পরিবহন বন্ধ থাকায় পণ্য রফতানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। প্রচুর আদেশ বাতিল ও ডেফার হয়।
রফতানিকারকদের সংগঠন ইএবির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ব্যবসায়ীরা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। দুই দলের মধ্যে একটি সমঝোতা না হলে এদেশের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এর দায়ভার দুই দল বা জোটকেই নিতে হবে। এমনিতেই বিশ্বমন্দার কারণে বাংলাদেশের রফতানি খাত কিছুটা স্থবির। তারপর এভাবে অস্থিরতা চলতে থাকলে কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহিদুলল্গাহ আজিম বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে এরই মধ্যে ২৫ শতাংশ রফতানি আদেশ কমেছে। এছাড়া আদেশ বাতিল ও জাহাজীকরণ বাতিল হচ্ছে প্রায়ই। বাটেক্সপোতে প্রধান দুই দলের নেতাদের কাছে রাজনৈতিকভাবে ব্যবসায় সহযোগিতা চাওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই।
চামড়া রফতানিকারকরা বলেন, কোরবানির ঈদের দুই সপ্তাহ পর ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া আসতে শুরু করে। পুরো দুই থেকে তিন সপ্তাহ ঢাকার ট্যানারিগুলোতে আসে। এবার প্রায় দেড় কোটি চামড়া প্রক্রিয়া করতে হবে। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া আছে ৬০ লাখ। সাধারণত লবণ দিয়ে দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময় চামড়া রাখা যায়। এরপর ট্যানারিতে নিয়ে আসতে না পারলে চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই চলমান এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়্যারম্যান বেলাল হোসেন বলেন, এ সপ্তাহ থেকেই ঢাকার বাইরের চামড়া আসার কথা রয়েছে। পরিবহন ধর্মঘট বা হরতালের কারণে চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এবারের ঈদে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার চামড়া ক্রয় হয়েছে।
এদিকে, দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান না হলে অর্থনীতির অন্যান্য খাতের মতো রফতানি খাতও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। গত অর্থবছরের রফতানি খাত বেশ ভালো করেছে। জিডিপিতে রফতানি খাতের অগ্রগতি ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু চলতি অর্থবছরের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার কারণে তা কমে গিয়ে ১১ শতাংশ হতে পারে বলে ভবিদ্বাণী করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, পোশাক খাতের অস্থিরতা লাঘব করা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর শর্তাবলী পূরণ না করতে পারলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করতে পারে। আর এটি বাতিল করলে শুধু পোশাক খাতের রফতানি আয় কমবে ৪ থেকে ৮.১ শতাংশ পর্যন্ত। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সমাধান না হলে রফতানি খাত বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)সহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সংস্থা ভবিষ্যদ্বাণী করেছে।

http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/11/03/223084#.UnZ_UlNV9aQ


About Author

Profile Picture

Golden Bangladesh

Golden Bangladesh is a point of access to information.We present information from diverse sources in a unified way. It is the leading web portal, e-Directory and business guide in Bangladesh.

Leave a Comment