৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশজুড়ে আতঙ্ক : দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মাত্রা ও দীর্ঘস্থায়ী কম্পন : ভারত ও নেপালে ১২ জন নিহত

৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশজুড়ে আতঙ্ক : দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মাত্রা ও দীর্ঘস্থায়ী কম্পন : ভারত ও নেপালে ১২ জন নিহত

 

প্রচণ্ড ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ। গতকাল সন্ধ্যায় রিখটার স্কেলের ৬.৮ মাত্রার এই ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। দেশের ৬১ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মাত্রা ও দীর্ঘস্থায়ী এ ভূ-কম্পনে বিভিন্ন স্থানে হেলে পড়েছে দালান, দেখা দিয়েছে ফাটল। ভূমিকম্পের সময় নগরীর বহুতল ভবন দুলতে থাকলে আতঙ্কগ্রস্ত লোকজন সিঁড়ি বেয়ে রাস্তায় নেমে আসে। হুড়োহুড়িতে ঢাকায় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।
আমেরিকান জিওলজিক্যাল সার্ভের উদ্ধৃতি দিয়ে আবহাওয়া অফিস জানায়, ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ছিল সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক থেকে ৬৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। স্থানটি সিকিম ও নেপাল সীমান্তে অবস্থিত। এই ভূমিকম্পে বাংলাদেশের বাইরে ভারতে ৭ জন এবং নেপালে ৫ জনসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছে। সিকিমে ৪ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হয়েছে। বিহারে ৭ বছরের একটি মেয়েসহ দু’জন মারা গেছে। পশ্চিমবঙ্গে মারা গেছে একজন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এবং ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি, লক্ষেষ্টৗ, কলকাতা, জয়পুর, ঝাড়খণ্ড, গোহাটি, পাটনাসহ বেশ কিছু জায়গায় এ ভূ-কম্পন অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পে নেপালে ৫ জনের মধ্যে ৩ জন মারা গেছে রাজধানী কাঠমান্ডুতেই। ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অনেক দালান ও বহুতল ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া গ্যাংটক ও দার্জিলিংয়ে কোনো বিদ্যুত্ নেই। সিকিমের কিছু অংশে টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পের পর পশ্চিমবঙ্গে ফোন লাইনে ব্যাপক জ্যাম তৈরি হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনীর পাঁচটি বিমান এবং সেনাবাহিনীর একটি টিম উদ্ধার তত্পরতা চালাতে সেখানে গেছে।
ঢাকার কারওয়ানবাজারে বিএসইসি ভবনের ১১ তলায় দৈনিক আমার দেশ অফিসে গতকাল সন্ধ্যায় ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল— প্রথমে ভাবলাম মাথা ঘোরাচ্ছে। মুহূর্তেই দেখি চেয়ার-টেবিলসহ পুরো ভবন দুলছে। যেন নৌকায় বসে কেউ দোলা দিচ্ছে। সহকর্মীরা দৌড়ে যাচ্ছেন সিঁড়ি দিয়ে নিচে। সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আতঙ্কিত। প্রায় দুই মিনিট ধরে যেন মৃত্যু বা বড় বিপর্যয়ে পড়তে যাচ্ছে। সবাই আল্লাহকে ডাকছেন। মোবাইলে খোঁজ নিচ্ছেন যার যার বাসায় এবং স্বজনদের। এরই মধ্যে ফোনের নেটওয়ার্কে জ্যাম। প্রায় কলাপস। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলো। যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেলাম। এমন অবস্থা শুধু আমার দেশ অফিসেই নয়, রাজধানীসহ সারাদেশের সর্বত্রই। সারাদেশের মানুষের একই প্রতিক্রিয়া—এত দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্প কখনও অনুভূত হয়নি। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, বিগত ৬১ বছরের মধ্যে গতকালের ভূমিকম্পটি ছিল সবচেয়ে বড় মাপের। তবে ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ঢাকা থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় এ যাত্রায় বড় ধরনের ধ্বংসলীলা থেকে বেঁচে গেল বাংলাদেশ।
গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিট থেকে ৪৪ মিনিট পর্যন্ত ভূমিকম্পটি ২ মিনিট স্থায়ী হয়। ওই সময় ঘটে যায় ঢাকার ইতিহাসে প্রায় ৬১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প। ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পটির রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে ১১৯ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর-পশ্চিম, নেপালের কাঠমান্ডু থেকে ২৭২ কিলোমিটার পূর্বে এবং কলকাতা থেকে ৫৭২ কিলোমিটার উত্তরে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কম্পন অনুভূত হয় বৃহত্তর দিনাজপুর, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা এলাকায়।
গত সন্ধ্যার ভূমিকম্পের ফলে রাজধানী ঢাকার বড় ভবনগুলো হঠাত্ করে দুলে ওঠে। এ সময় বহুতল ভবনে থাকা মানুষ সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নিচে নামে। কে কার আগে কত দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নামতে পারে—প্রাণ বাঁচানোর এই প্রতিযোগিতায় নামে সবাই। হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে অনেকে পড়ে গিয়ে কম-বেশি আহত হয়েছেন। বহুতল ভবনে লিফটে থাকা মানুষ আতঙ্কে চিত্কার শুরু করেন। দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় এক নজিরবিহীন ভীতিকর পরিস্থিতি।
ভূমিকম্পে ঢাকার মহাখালীতে বৈশাখী টেলিভিশন চ্যানেলের ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। মোহাম্মদপুর ৯/১৪, ইকবাল রোডের ‘সনরিসা ডোমিনোর একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিচের পিলারে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে। ঝিগাতলায় ১১ তলা একটি ভবন ও বড় মগবাজারের গ্র্যান্ড প্লাজা ও কুশল ভবনসহ নগরীতে বেশক’টি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। লালবাগের পোস্তায় কাজী রিয়াজ উদ্দিন রোডের ২৭/১/এ বাড়ির ছয়তলা ভবন থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় পিছলে পড়ে যায় নাসরিন (১৪)। এ সময় অন্যদের পায়ে দলিত হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে সে। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ তলা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছে এক ছাত্র।
সূত্রাপুরের ২৫ হেমন্ত দাস লেনের বাসিন্দা শাহ মো. আরিফ বিল্লাহ জানান, ভূমিকম্পে সেখানে ২-৩টি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। বগুড়ায় সাততলা ভবন তৌহিদ প্লাজা ও টাওয়ার ভিশন ভবনসহ ৪টি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। পাবনা ফায়ার সার্ভিস অফিস, স্থানীয় জীবন কথা অফিস, বেড়া পৌর ভবনসহ অন্তত ১০টি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে উপজেলায় রেলওয়ের একতলা ভবন ধসে গেছে। বড়পুকুরিয়া শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মানিক জানান, ভূমিকম্পে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার জিগারবাড়ি গ্রামে ১০টি এবং মৌপুকুর গ্রামে পাঁচটি মাটির ঘর ভেঙে গেছে। দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা থেকে ভূমিকম্পে মানুষ আতঙ্কিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল সিকিমে বেশক’টি ভবন ধসে পড়েছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিদ্যুত্ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে করণীয় নির্ধারণে জরুরি বৈঠকে বসেছেন।
ভূমিকম্পের পর তাত্ক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দফতর জানায়, ভূমিকম্পটির উত্পত্তিস্থলে মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬.৮ মাত্রা। এর উত্পত্তিস্থল ভারতের উত্তর-পূর্বে হিমালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের সিকিম এলাকায়। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, উত্পত্তিস্থলে ৬.৮ মাত্রা হলেও বাংলাদেশে অনুভূতির মাত্রা কিছুটা কম হতে পারে।
নগরীর বিভিন্ন বয়সী মানুষ জানায়, তাদের জীবনে কখনও এত বড় ভূমিকম্প দেখেননি। এতে আতঙ্কিতও হয়ে পড়েছেন অনেকে। ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হওয়ার পাশাপাশি সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। সবাই ছোটাছুটি শুরু করেন আশ্রয়ের খোঁজে। ভূমিকম্পের এক ঘণ্টা পরও স্থির হতে পারেনি মানুষ। কেমন যেন মাথা ঘোরায় অনেকের। আতঙ্কিত হয়ে ফোন করেন স্বজনের কাছে। সবাই বলেন, এ যাত্রায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলাম। কারওয়ান বাজার বিএসইসি ভবনের কর্মকর্তা খোন্দকার ফারুক বলেন, মৃত্যু যে এত কাছে, মানুষ যে কত অসহায়—সেটাই বুঝিয়ে দিল ভূমিকম্প।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আবু নাঈম মো. শহীদুল্লাহ বলেন, এত বড় ভূমিকম্প সহসা হয়নি। ঢাকার কিছু এলাকায় ভবন ধসের খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু সরেজমিনে ফায়ার সার্ভিসের টিম সেগুলো পরীক্ষা করে সত্যতা পায়নি। বগুড়া ও দিনাজপুর অঞ্চলে কিছু ভবন ধসের খবর পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, দেশের কোথাও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছেন।
বাংলাদেশ আর্থ কোয়াক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী আমার দেশকে জানান, বিগত ৬১ বছরের সবচেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প ছিল এটি। এর আগে ১৯৫০ সালে আসামে ৮.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এরপর বিগত ৬১ বছরে এত বড় ভূমিকম্প বাংলাদেশ ও সীমান্ত এলাকায় হয়নি। তিনি বলেন, ‘এ ভূমিকম্প অনুভূত হয় দুই মিনিটের সামান্য কম সময়ে, যা বিশ্বের যে কোনো বড় ভূমিকম্পের প্রায় কাছাকছি। তিনি বলেন, ‘এর উত্পত্তিস্থল ছিল হিমালয় সংলগ্ন সিকিম। এর মাত্রা ছিল ভয়াবহ; কারণ ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের অনেক ওপরে।’ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনসারী বলেন, ‘ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে আগামীকাল পর্যন্ত।’
ঢাকা থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের এই ভূমিকম্প ঢাকায় কেন এত বেশি অনুভূত হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর জানান, মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে একটি ৪.৮ এবং ৬.৮ মাত্রার কম্পন হয়েছে—যা সারা বাংলাদেশে অনুভূত হয়েছে। কম্পনটির লংওয়েভ এসেছে ঢাকায়। যার কারণে এর কম্পন ও অনুভূতি স্বাভাবিক ৬.৮ মাত্রার কম্পনের চেয়ে অনেক বেশি। কম্পনটি ছোট বাড়িগুলোর তুলনায় বহুতল ভবনগুলোতে বেশি কাঁপন অনুভূত হয়েছে। ড. মুনাজ বলেন, এখন আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সাধারণত বড় কম্পনের পর পরবর্তী কম্পনগুলো ছোট হয়। তবে ভূমিকম্প কখন হবে—তা নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক জানান, এ পরিস্থিতিতে দেখা গেছে অনেকেই হুড়োহুড়ি করে নামছেন; এটা উচিত নয়। সবার উচিত নিজ নিজ কক্ষে থাকা। মাথা নিরাপদে রাখা। মাথার ওপর একটা কিছু দিয়ে রাখা। তিনি আরও বলেন, ভূমিকম্পের ২৪ ঘণ্টা পরও পুনরায় ভূমিকম্প হতে পারে। তাই সতর্ক থাকা উচিত।
আমার দেশের জেলা, উপজেলা প্রতিনিধি ও ব্যুরো অফিস থেকে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া এবং মানুষ আতঙ্কিত হওয়ার খবর পাঠানো হয়েছে।
যশোর অফিস জানায়, যশোর এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ সময় আতঙ্কে লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তা বা খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসে। তবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। মতিউর রহমান বিমানঘাঁটির আবহাওয়া দফতর থেকে জানানো হয়েছে, ভূমিকম্পের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় দুই মিনিট। রিখটার স্কেলে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পটির উত্পত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম অঞ্চলে।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ভূমিকম্পের পরপর শহরের বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রতিনিধি জানান, ভূমিকম্পের সময়ে হলে থাকা শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে আসেন। রাবি ক্যাম্পাসের দেয়ালের প্রায় ১০ ফুট পরিমাণ ভেঙে পড়েছে ভূমিকম্পের কারণে। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে এর সত্যতা নিরূপণ করা যায়নি।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, শ্রীরামপুর ইউনিয়নে রকিব হোসেন নামে এক যুবক বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দুই ঘণ্টায়ও তিনি কথা বলতে পারেননি। তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। লালমনিরহাট শহরের গোল্ডেন টাওয়ারের চতুর্থ তলা ও আছির প্লাজার পঞ্চম তলাসহ বেশ কয়েকটি ভবনে ফাটল ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাটগ্রাম থেকে আজিনুর রহমান আজিন জানান, দোয়ানী তিস্তা ব্যারাজ, তিস্তা সেতু, উঁচু দালানসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে পড়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়। দোয়ানী তিস্তা ব্যারাজের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাইনুদ্দিন মণ্ডল জানান, গত কয়েক বছরেও এ রকম অধিক স্থায়ী ভূকম্পন হয়নি।
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার সর্বত্র তীব্রমাত্রার ভূমিকম্পন অনুভূত হয়েছে। এতে জেলার সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, দুই দফায় প্রায় চার মিনিট স্থায়ী ছিল এ ভূকম্পন। ভীত সন্ত্রস্ত লোকজন ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। দোকান পাট থেকে লোকজন বাইরে বেরিয়ে আসেন। বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়। ইসলামবাগের প্রবীণ ব্যক্তি ঈসমাঈল হোসেন (৭০) বলেন, এমন দীর্ঘ সময় ধরে ও প্রচণ্ড ভূকম্পন অনুভব করিনি। অনেক বাসার শোকেসের জিনিসপত্র কম্পনের ফলে পড়ে যায়।
আটোয়ারী উপজেলার ছোটদাপ এলাকার ফজলুল করিমের কন্য তন্নি বেগম (১৭) নামে এক কিশোরী অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় নদী ও পুকুরের পানি ওপরে চলে আসে। নারী পুরুষরা আল্লার নাম জপ করতে থাকে। ইসলামবাগের গৃহিণী মমতাজ বেগম বলেন, কাঁপুনিতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে যায়। তেঁতুলিয়ার কবীর হোসেন জানান, অনেকের ঘরবাড়ির দেয়ালে ফাটল ধরেছে। গ্রামীণ ফোন কাস্টমার কেয়ারের ওয়াল পড়ে গেছে।
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের প্রধান মো. তোহিদুল বারী বলেন, পঞ্চগড় অঞ্চল বাংলাদেশের দ্বিতীয় ভূকম্পনপ্রবণ এলাকা। এর আগে এ মাত্রার ভূকম্পন অনুভব করিনি। এর আগে আসামে রিখটার স্কেল ৮ মাত্রার ভুকম্পন ছিল। তখন এ অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। পঞ্চগড় থেকে দুইশ’ কিলোমিটারের মধ্যে এ ভূকম্পের উত্পত্তিস্থল হওয়ায় পঞ্চগড়ে এমন ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। তেতুলিয়া প্রতিনিধি জানান, ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও গাছপাড়া উপড়ে পড়েছে। তবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় গতকাল রোববার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সন্ধ্যা পৌনে ৭ টার দিকে প্রায় এক মিনিট স্থায়ী এ ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে নগরী ও আশপাশের এলাকা। প্রচণ্ডভাবে দুলে উঠে বহুতল ভবনগুলো। তবে একতলা বা দুইতলা ভবনে ভূমিকম্প তেমন অনুভূত হয়নি। নগরীর চেরাগী পাহাড় এলাকার বাসিন্দারা জানান, সেখানকার ভবনগুলো থেকে আতঙ্কে লোকজন নিচে নেমে আসেন। নগরীর অন্য এলাকাগুলোতেও ছিল একই অবস্থা। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন জানান, তারা ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাননি। তবে বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প হয়েছে বলে খবর পেয়েছেন। স্থানীয় লোকজন জানান, তারা প্রায় ১ মিনিট ধরে কম্পন অনুভব করেছেন।
এদিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝামাঝি টেকটোনিক প্লেটের অবস্থান এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর আশপাশে একাধিক স্থানে ভূগর্ভে বিপজ্জনক ফাটল সৃষ্টি হওয়ার কারণে এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ছোটখাট ভূমিকম্পগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পেরই পূর্বাভাস। ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘটে যেতে পারে মহাবিপর্যয়। এ ধরনের ভূমিকম্প হলে ধসে পড়তে পারে চট্টগ্রামের লক্ষাধিক ভবন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম জানান, ইউরেশিয়া ও ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের মাঝে চট্টগ্রামের অবস্থান। প্লেটগুলো ভূ-ত্বকের অভ্যন্তরে সচল হয়ে উঠলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। রিখটার স্কেলে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতি হবে, যদি ওই ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল চট্টগ্রামের কাছাকছি এলাকায় হয়।
রাজশাহী অফিস জানায়, সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটের দিকে পরপর কয়েক দফা ভূকম্পন অনুভূত এবং বাড়িঘর নড়ে উঠে। এতে রাজশাহী মহানগরীর নওদাপাড়া এলাকায় ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের ভবনসহ বিভিন্ন এলাকায় কিছু সংখ্যক ভবন-বাড়িঘর ডেবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও কোথাও বড় ধরনের কোনো ক্ষয়-ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। রাজশাহীতে এর স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ২ মিনিট। বাড়িঘর দুলে উঠলে সবাই বাড়িঘর ও ভবন থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। আতঙ্কিত হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় হৈচৈ করছিল। তথ্য সূত্রে জানা যায়, ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিমে এবং এর মাত্রাছিল ৬.৮ রিখটার স্কেল। রাজশাহীতে এর স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ২মিনিট।
স্টাফ রিপোর্টার নারায়ণগঞ্জ জানান, ভূমিকম্পের কারণে আতঙ্কিত হয়ে শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দারা দৌড়ে বাড়ি থেকে নেমে আসেন। ভূমিকম্পের কারণে সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভূমিকম্পে নারায়ণগঞ্জে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক আহসানুল কবির।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, জেলা সদরসহ সবকটি উপজেলায় গতকাল রোববার সন্ধ্যায় আকস্মিক মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এ সময় নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা উপজেলায় জলকম্পনের সৃষ্টি হয়েছে। শহরের লোকজন বাসা-বাড়ি, দোকানপাট থেকে রাস্তায় নেমে আসেন। সবার মাঝে ভীতির সঞ্চার হয়। ভূমিকম্প চলাকালে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে পড়ে ।
জানা গেছে, গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে আকস্মিক নেত্রকোনা সদর, কলমাকান্দা, দুর্গাপুরসহ ১০টি উপজেলায় এক মিনিটের অধিক সময় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্প চলাকালে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুড়া ইউনিয়নের অর্ধশত কাঁচাবাড়ি বিধ্বস্ত হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি ।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁ শহরসহ আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প হয়েছে। শহরের বিদ্যুত্ সরবরাহ কিছুক্ষণের জন্যে বন্ধ করে দেয়া হয়। ভূমিকম্পের সময় একটি স্কুল ভবনসহ কয়েকটি বাড়িতে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। জেলার পোরশা উপজেলা সদরসহ অন্য উপজেলাতেও ভূমিকম্প হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ি, সাদুল্লাপুরসহ ৭ উপজেলায় এই ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। এ সময় শহরের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। বাড়িঘর থেকে লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
ইবি প্রতিনিধি জানান, শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আবাসিক হলগুলো হঠাত্ কেঁপে উঠলে সাদ্দাম হোসেন হলের দক্ষিণ ব্লকের তিনতলা থেকে নুরুল আমিন নামের এক শিক্ষার্থী লাফ দিয়ে পড়ে হাত-পা ভেঙে গেছে। নুরুল আমিন ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। আহত নুরুল আমিনকে ইবি মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে।
এছাড়া আমাদের সিলেট অফিস, বরিশাল অফিস, পাবনা অফিস, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি, মেহেরপুর, জামালপুর, নীলফামারি, নাটোর প্রতিনিধি, শেরপুরের নলিতাবাড়ি প্রতিনিধি, রপুরের বদরগঞ্জ প্রতিনিধি, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও মাধবপুর প্রতিনিধি, দািজপুরের বিরামপুর প্রতিনিধি, নাটোরের সিংড়া প্রতিনিধি, মৌলভী বাজারের কমলগঞ্জ প্রতিনিধি, দিনাজপুরের হিলি প্রতিনিধি, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর প্রতিনিধি, রাজবাড়ির গোয়ালন্দ প্রতিধি, নওগাঁওয়ের ধামইরহাট প্রতিনিধি, ভূমিকম্পে আতঙ্ক ও ভয়ভীতির খবর পাঠিয়েছেন।

About Author

Profile Picture

Golden Bangladesh

Golden Bangladesh is a point of access to information.We present information from diverse sources in a unified way. It is the leading web portal, e-Directory and business guide in Bangladesh.

Leave a Comment